1. admin@dailygoraishobvotha.com : admin : salim takku
  2. takku.kst@gmail.com : salim takku : salim takku
মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২১, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন

এমন ‘ফেসবুকীয় সাংবাদিকতা’ কতটা অপরিহার্য

প্রতিবেদকের নাম :
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২০
  • ৯৬ বার পঠিত

ফেসবুক সাংবাদিকতায় বুক কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো কিছু ঘটনার জন্ম দিয়েছে। ধর্ষকের সচিত্র সংবাদ, নারী নির্যাতন, এমন স্পর্শকাতর অনেক কিছুই ফেসবুক মাধ্যমে প্রথম জানাজানি হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। নিঃসন্দেহে এগুলো ইতিবাচক দিক। কিন্তু ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা চ্যানেল যেভাবে সংবাদের তেরটা বাজাচ্ছে, যেভাবে ক্ষতিকর প্রচারণায় নেমেছে, সেগুলো আমাদের গণমাধ্যম জগতকে কোথায় নিয়ে যাবে, ভাবনার বিষয়।

সত্য, মিথ্যা কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ বা রাজনৈতিক স্বার্থ বিষয়ের বাইরেও একটা বিষয় আছে। যা সাধারণ মানুষকে সংবাদ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিতে পারে। শুধু তাই নয়, কোনও কোনও ক্ষেত্রে এসব চ্যানেল কিংবা ফেসবুক লাইভগুলো সমাজ, এমনকি আইনেরও লঙ্ঘন করছে। একটা উদাহরণ দিতে পারি।

নিবন্ধটি লেখার প্রাক্কালে আমার এক বন্ধু আমাকে একটা ভিডিও ইনবক্স করেছেন। টুপিধারী ‘মোটাতাজা’ একজন হুজুর। তিনি কয়েকজনের হামলার মুখে আছেন। একজন নারীকণ্ঠ শোনা গেলো সেখানে। খুবই রাগান্বিত। কয়েকজন হুজুরকে রক্ষায়ও এগিয়ে এলেন। তারাও হুজুর। তবে রক্ষা করতে এসে তাদের খুবই ভদ্রোচিত আচরণ করতে দেখা গেলো। কিন্তু কিছু মানুষকে দেখা গেলো উত্তেজিত।

উত্তেজনার ছবি চলতে চলতেই একসময় প্রতিবেদকের কণ্ঠ ভেসে এলো। জানা গেলো, নারায়ণগঞ্জের একটি মাদ্রাসার ওই শিক্ষক ১১ বছর বয়সের একটি বালককে ধর্ষণ করেছে। বিষয়টি এই গতিতে এগিয়ে গেলে হয়তো এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন হতো না। কিন্তু পরের দৃশ্যটা দেখার পর মনে হলো, মাদ্রাসা শিক্ষক যে অপরাধে অভিযুক্ত, এই ভিডিও প্রচারের পর প্রতিবেদকও সম-অপরাধে অভিযুক্ত হতে পারেন। কারণ, তিনি শিশুটির সামনে চলে গেলেন। অবুঝ এই শিশুটির মুখ থেকে বের করে আনলেন, কীভাবে ওই হুজুর ঘুমের ওষুধ সেবন করিয়ে তাকে ধর্ষণ করেছে। কিংবা তাকে কীভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, অপরাধটি কি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে তাও বর্ণনা করানো হলো শিশুটির মুখ থেকে।

এই ফেসবুক সাংবাদিকের সংবাদটির বিষয়ে আর বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন আছে কি? তিনি সংবাদটি শেষ করলেন, আমাদের প্রতিবেদনটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে সাবস্ক্রাইব করুন বলে।

ভিকটিমকে এভাবে জনসমক্ষে প্রকাশের অধিকার কি কোনও সংবাদকর্মীর আছে? ওই ফেসবুক সাংবাদিকের সাধারণ এই ধারণাটুকু নেই বিশ্বাস করতে পারি না। তাহলে কীভাবে ছোট শিশুটির মুখ এভাবে দেখানো হলো। একটা হতে পারে, বেশি দর্শক পাওয়া। না হয় তিনি সাংবাদিকতার সামান্য নীতিমালা সম্পর্কেও জানেন না।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে স্পষ্টত বলা আছে ভিকটিমের ছবি কিংবা পরিচিতি প্রকাশ করা যাবে না। বলা আছে-
‘অপরাধের শিকার হয়েছেন এমন নারী বা শিশুর ব্যাপারে সংঘটিত অপরাধ বা এ সম্পর্কিত আইনগত কার্যধারার সংবাদ বা তথ্য বা নাম-ঠিকানা বা অন্যবিধ তথ্য কোনও সংবাদপত্রে বা অন্য কোনও সংবাদমাধ্যমে এমনভাবে প্রকাশ বা পরিবেশন করা যাবে, যাতে উক্ত নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ না পায়।’ আইনে আরও বলা হয়, ‘এই বিধান লঙ্ঘন করা হলে দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের প্রত্যেকে অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।’

কিন্তু ভিডিওতে স্পষ্টভাবে বালকটির মুখই শুধু দেখানো হয়নি, তার মুখ থেকে বর্ণনাও আদায় করা হয়েছে তার পিঠে হাত বুলিয়ে- আদর করে। কিন্তু এই শিশুটির এতে যে ক্ষতিটা হয়েছে, তা বোধ করি তার শিক্ষক (!) নামধারী ব্যক্তিটিও করতে পারেনি।

তথাকথিত ভিডিও চ্যানেলের সংবাদে শুধু নতুনরাই আসছে না। কদিন আগে একজন সাবেক সাংবাদিককে দেখলাম একজন রাজনৈতিক নেতা সম্পর্কে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি মাধ্যমে নাম বিকৃত করে বানোয়াট একটি সংবাদ প্রচার করছেন। একজন রাজনৈতিক নেতার অনেক দোষত্রুটি থাকতে পারে, তিনি জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাতও হতে পারেন কিন্তু পেশাজীবী সাংবাদিক কি ওই রাজনৈতিক নেতার নাম বিকৃতভাবে সংবাদে উচ্চারণ করতে পারেন? স্পষ্ট বোঝা গেছে সংবাদ পরিবেশনকারী একটি পক্ষ অবলম্বন করে সংবাদটি পরিবেশন করেছেন।

শুধু তাই নয়, ওই নেতার বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগও আনলেন। অথচ ওই নেতার যুদ্ধকালীন কমান্ডার যিনি এখন ওই নেতার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, তার সঙ্গেও আমি আলাপকালে জেনেছিলাম, ১৯৭১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চারগাছ এলাকায় অল্পের জন্য ওই নেতাসহ তারা রক্ষা পেয়েছিলেন কীভাবে। তার মানে যাকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই সাবেক সাংবাদিক প্রচার করলেন, তার প্রতিপক্ষও বললেন, হ্যাঁ সেই ব্যক্তিটি তার অধীনে যুদ্ধে ছিল। এই সাংবাদিক কিন্তু গণমাধ্যমে নবাগত নন। প্রথম শ্রেণির টেলিভিশনে প্রতিবেদক হিসেবে কাজও করেছেন একসময়। মাঝ বয়সের এই সাংবাদিক নিশ্চয়ই সাংবাদিকতার নীতিমালা সম্পর্কে ভালো করেই জানেন। কিন্তু আমেরিকায় বসে ফেসবুক মাধ্যমে ইচ্ছামতো কারও ওপর ঝাল মিটিয়ে নিচ্ছেন কিংবা অন্য কোনও উদ্দেশ্য চরিতার্থ করছেন। এটাও হচ্ছে শুধু ফেসবুক সাংবাদিকতার বদৌলতে।

সম্প্রতি এই যৌন অপরাধগুলো নিয়ে দেশব্যাপী সাধারণ মানুষ সোচ্চার হয়েছে। প্রতিদিনই প্রতিবাদ মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। সরকারি দল বিরোধী দল নির্বিশেষে সবাই এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- ধর্ষকদের বিচার দ্রুততর সময়ে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করাসহ সংবাদমাধ্যমের কালো এই দিকটিকেও বন্ধ করার কথা ভাবা হচ্ছে কিনা? সেই জন্য বিটিআরসি কিংবা প্রযোজ্য সংস্থার ভূমিকা আছে বলে মনে করি। ক্ষতিকর সংবাদসমূহ যাতে প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করা যায়, সেই ব্যবস্থা অতি জরুরি বলে মনে করি।

কিছু ব্যক্তি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করছে। ওয়াজ মাহফিলের নামে বিষ ছড়ানোর বিষয়টি নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। এগুলো বন্ধ করা না গেলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

ইতোমধ্যে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে শাস্তির স্তর বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে, শাস্তি হিসেবে শুধুই মৃত্যুদণ্ড রাখা হলে তা আগের মতো নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। সেক্ষেত্রে যাবজ্জীবন, আমরণ ও মৃত্যুদণ্ড এই তিন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা ভেবে দেখা উচিত। শুধু সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকলে বিচারে দীর্ঘসূত্রতা হতে পারে। আর ভিকটিমের ছবি কিংবা নাম পরিচয় প্রকাশের যে শাস্তির বিধান আছে তা এখনই কার্যকর করতে হবে।

যেসব ভিডিও চ্যানেল যথেচ্ছ সংবাদ প্রচার করে ধর্ষণের পর আবার ধর্ষণ করছে তাদের শাস্তিও যাতে দ্রুত বিচার আইনে সম্পন্ন হয় সেটুকুও দেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।

এ বিষয়ে কিছু ব্যক্তি সরাসরি রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার প্রয়াস পাচ্ছে। তাদের প্ল্যাকার্ডগুলো ফেসবুকে হরদম ভাইরাল হচ্ছে। সরকারের বিরোধিতা করার অধিকার যেকোনও নাগরিকের আছে। কিন্তু এমন কিছু ইস্যু তৈরি করা কি যথাযথ যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এবং যা ধর্ষকদেরই উৎসাহিত করতে পারে? সরকার ধর্ষণের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে, তারপরও এই ধরনের প্ল্যাকার্ড ভাইরাল করার উদ্দেশ্য কি? সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতি দ্রুত বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দেবে বলে আশা করি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2020 Daily Gorai
Theme Customized BY Mustakim Jony